26/08/2016
সাবধান বাংলাদেশ !!!!!!!
জীবন বাঁচাতে শেয়ার করুন......
Prothom Alo বাংলাদেশ News ...
দেশে তরল পেট্রোলিয়াম (এলপি) গ্যাসের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। তবে এই গ্যাসের সিলিন্ডারের নিরাপত্তার দিকটি প্রায় উপেক্ষিত। গ্যাসভর্তি সিলিন্ডার বাজারে ছাড়ার আগে এর মান পরীক্ষা করা হয় সংশ্লিষ্ট কোম্পানির দেওয়া কাগজপত্রের ভিত্তিতে। সিলিন্ডারগুলো নিয়মিত পরীক্ষাও করা হয় না।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি), বিস্ফোরক অধিদপ্তর এবং বেসরকারি এলপি গ্যাস কোম্পানিগুলোর সূত্রের সম্মিলিত হিসাব অনুযায়ী দেশে বর্তমানে এলপি গ্যাসের সিলিন্ডার আছে প্রায় ২০ লাখ। এর মধ্যে অন্তত দুই লাখ মেয়াদোত্তীর্ণ। প্রায় তিন লাখ অতি পুরোনো। গ্যাস ভরে বাজারে ছাড়ার আগে সিলিন্ডারের মান পরীক্ষা করে সনদ দেয় বিস্ফোরক অধিদপ্তর। কী ধরনের পরীক্ষা করেন জানতে চাইলে অধিদপ্তরের প্রধান পরিদর্শক মো. শামসুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা মূলত এ-সংক্রান্ত কাগজপত্র পরীক্ষা করে সনদ দেন।
শামসুল আলম বলেন, দেশে কিংবা বিদেশে সিলিন্ডার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো স্বীকৃত কোনো তৃতীয় পক্ষের উপস্থিতিতে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সিলিন্ডার পরীক্ষা করে। সে অনুযায়ী সিলিন্ডারগুলোর যাবতীয় তথ্যসংবলিত মানপত্র ক্রেতার (আমদানিকারক কিংবা দেশের বিতরণ কোম্পানি) কাছে দেওয়া হয়। তাঁরা সেই কাগজপত্র অধিদপ্তরে জমা দেন। বিস্ফোরক অধিদপ্তর সেই কাগজপত্র পরীক্ষা করে সিলিন্ডার বাজারজাত করার সনদ দেয়। অধিদপ্তরের জনবলের অভাবে এরপর নিয়মিত বিরতিতে সিলিন্ডারগুলো পরীক্ষার কোনো উদ্যোগ তাঁরা সাধারণত নিতে পারেন না। এলপি গ্যাস ছাড়াও যানবাহনে সিএনজির জন্য সিলিন্ডার ব্যবহার করা হয়। অনেক যানবাহনের সিলিন্ডারের গুণগত মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। মাঝেমধ্যে যানবাহনের সিলিন্ডার বিস্ফোরণে হতাহতের ঘটনাও ঘটছে।
সরকারি-বেসরকারি সূত্রগুলো জানায়, সিলিন্ডার ছাড়াও এলপি গ্যাস ব্যবহারের জন্য গ্রাহকের বাসায় চুলাসহ যে স্থাপনা তৈরি করতে হয়, তাতে ব্যবহৃত জিনিসপত্রের মানও অধিকাংশ ক্ষেত্রে খারাপ। ফলে ‘গ্যাস লিক’ হওয়া, আগুন ধরে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, এ বছর বিভিন্ন স্থানে এলপি গ্যাসের সিলিন্ডার বিস্ফোরণে ৩ জন নিহত ও অন্তত ১৩ জন আহত হয়েছেন। কিন্তু এলপি গ্যাসের নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করতে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই।
গত শনিবার বগুড়ায় বিপিসির গুদামে এলপি গ্যাসের প্রায় ৩০০ সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হওয়ার পর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে নড়াচড়া শুরু হয়। বিষয়টি নিয়ে সভার পর প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপিসির সব সিলিন্ডার (প্রায় পাঁচ লাখ) পরীক্ষা করার নির্দেশ দেন।
সরকারি হিসাবে দেশে বছরে এলপি গ্যাসের চাহিদা তিন লাখ টনের বেশি। এর বিপরীতে বেসরকারি আটটি কোম্পানি আমদানীকৃত প্রায় ৮০ হাজার টন এলপি গ্যাস বাজারজাত করছে। বেসরকারি কোম্পানিগুলোর মোট সিলিন্ডার ১৫ লাখের বেশি। এসব সিলিন্ডার পরীক্ষা করার মতো ল্যাবরেটরি নেই। বেসরকারি কোম্পানিগুলোর সিলিন্ডার পরীক্ষা বা মান নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে সরকার এখনো কিছু বলেনি।
সরকারি সূত্রের দাবি হলো, বেসরকারি কোম্পানিগুলোর সিলিন্ডার অপেক্ষাকৃত নতুন। সেগুলো নিয়মিত পরীক্ষাও করা হয়। তবে এর আগে দেশের বিভিন্ন স্থানে এলপি গ্যাসের যেসব সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে, তার সবই বেসরকারি কোম্পানিগুলোর।
এ ছাড়া দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে গ্যাসের উপজাত হিসেবে পাওয়া ‘কনডেনসেট’ (গ্যাসের সঙ্গে ওঠা তরল) দিয়ে সিলেটের কৈলাসটিলা ‘ফ্রাকশনেশন প্লান্ট’-এর মাধ্যমে বছরে প্রায় ২০ হাজার টন এলপি গ্যাস পাওয়া যায়। বিপিসির মাধ্যমে সরকারি খাতের বিপণন কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা সিলিন্ডারে এই গ্যাস বিপণন করে। বিপিসির সিলিন্ডার আছে পাঁচ লাখের মতো।
সিলিন্ডার পরীক্ষার বিষয়ে জানতে চাইলে বিপিসির পরিচালক (বিপণন) মীর আলী রেজা প্রথম আলোকে বলেন, শুধু চট্টগ্রামের পতেঙ্গা ও কৈলাসটিলায় তাঁদের সিলিন্ডার পরীক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। সিলিন্ডারে গ্যাসও ভরা হয় এখানে। এই দুই স্থানে সারা বছরই কিছু কিছু সিলিন্ডার পরীক্ষা করা হয়। এখন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী দুই মাসের মধ্যে প্রায় সব সিলিন্ডার পরীক্ষা করা হবে। এখন থেকে পরীক্ষা না করে তাঁদের একটি সিলিন্ডারও বাজারে ছাড়া হবে না।
এক প্রশ্নের জবাবে মীর আলী রেজা বলেন, সিলিন্ডারগুলো ছড়িয়ে আছে প্রত্যন্ত এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে। এখন খালি সিলিন্ডার দিয়ে গ্রাহক গ্যাসপূর্ণ যে সিলিন্ডার ডিলারের কাছ থেকে পাবেন, সেটি পরীক্ষা করেই দেওয়া হবে। কোনো খালি সিলিন্ডার ডিলারের কাছে জমা পড়লেই তা পরীক্ষাগারে আসবে। পরীক্ষা করে নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার পরই সিলিন্ডারে গ্যাস ভরে বাজারে পাঠানো হবে।
বিপিসি গত মঙ্গলবার থেকে তাদের সিলিন্ডার পরীক্ষা শুরু করেছে অঙ্গপ্রতিষ্ঠান এলপি গ্যাস লিমিটেডের পতেঙ্গা কার্যালয়ে। আগামী রোববার থেকে বিস্ফোরক অধিদপ্তর এই কাজে বিপিসিকে সহায়তা করবে। বগুড়ায় শনিবারের বিস্ফোরণের পর বিস্ফোরক অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগের পরিদর্শক বিপিসির অনেক সিলিন্ডার পরীক্ষা করেন। ওই সিলিন্ডারগুলোর ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ ঝুঁকিপূর্ণ বলে মতামত দেন তিনি।
বিপিসির পরিচালক (বিপণন) এ বিষয়ে প্রথম আলোকে বলেন, পাঁচ লাখ সিলিন্ডারের মধ্যে কতগুলো ঝুঁকিপূর্ণ বা ব্যবহারের অযোগ্য, সেটি পরীক্ষা শেষ হলে বোঝা যাবে। প্রথমে ঝুঁকিপূর্ণ চিহ্নিত হওয়া সিলিন্ডারগুলোর মধ্যে মেরামতযোগ্য ৫০ হাজার সিলিন্ডার মেরামত করা হবে। অন্যগুলো বাতিল করা হবে। তাঁরা ২০ হাজার নতুন সিলিন্ডার আমদানি করেছেন, যেগুলো শিগগিরই বাজারে ছাড়া হবে।
পাইপ লাইনের গ্যাস সরবরাহ না থাকা এলাকায় বাসাবাড়ি ও হোটেল-রেস্তোঁরায় রান্নার কাজে এলপি গ্যাস ব্যবহার করা হয়। কিছু যানবাহনেও এই গ্যাসের ব্যবহার শুরু হয়েছে। সরকার আবাসিক খাতে আর পাইপ লাইনের গ্যাস সরবরাহ না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গ্যাসের নতুন সংযোগও বন্ধ রেখেছে। ফলে এলপি গ্যাসের চাহিদা বাড়ছে। কিন্তু এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এর নিরাপত্তার দিকগুলো গুরুত্ব পাচ্ছে না, যার ফলে দুর্ঘটনার শঙ্কা বাড়ছে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার জ্বালানিবিষয়ক বিশেষ সহকারী ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পেট্রোলিয়াম ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ম তামিম প্রথম আলোকে বলেন, এলপি গ্যাস সিলিন্ডারজাত ও বাজারজাতকারী কোম্পানিগুলোর আরেকটু সতর্ক ও সচেতন হওয়া দরকার। আর সরকারের উচিত মনিটরিং বাড়ানো। সিলিন্ডারের মান ভালো হলে এবং সিলিন্ডারের মুখের ভাল্ভ ঠিকঠাক থাকলে দুর্ঘটনার তেমন আশঙ্কা এলপি গ্যাসে থাকে না। দুর্ঘটনাগুলো প্রধানত হয় ভাল্ভের সমস্যা থেকে গ্যাস লিক হয়ে।
এলপি গ্যাসের কয়েকজন ডিলার বলেন, সিলিন্ডারগুলোর পরিবহন এবং ট্রাকে ওঠানো-নামানোর পদ্ধতি মোটেই আধুনিক নয়। এ ধরনের দাহ্য পদার্থের পরিবহন ও নাড়াচাড়া হচ্ছে চাল-ডাল-পেঁয়াজের বস্তার মতো। আর অধিকাংশ ডিলার যে পরিবেশে এবং যে অবস্থায় সিলিন্ডারগুলো রাখেন, তা-ও নিরাপদ কিংবা যথাযথ নয়।
প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন চট্টগ্রামের নিজস্ব প্রতিবেদক সাঈদা ইসলাম