15/01/2021
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
ইসলামী ও সাধারণ শিক্ষার সমন্বিত
পাঠ্যক্রম"মানহাজ আল-মাজলিস"
আমাদের দেশে বৃটিশ ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তিত হওয়ার পূর্বে মুসলমানদের মধ্যে যে শিক্ষাব্যবস্থা প্রচলিত ছিল সেটা ছিল মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থা। আর যে পাঠ্যক্রম প্রচলিত ছিল সেটা ছিল দরসে নিযামী। দরসে নিযামী তৈরি হয়েছিল সম্পূর্ণত ইসলামী ও সাধারণ শিক্ষার সমন্বয়ে। এ পাঠ্যক্রমে এক দিকে যেমন ছিল পবিত্র কুরান,তাফসীর,উসুলত তাফসীর,হাদিস,উসূলুল হাদিস,ফিক্বহ,উসূলুল ফিক্বহ,আক্বাঈদ প্রভৃতি একান্ত ইসলামী বিষয়াদি তেমনি অন্যদিকে এ পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত ছিল অংক,জ্যোতির্বিজ্ঞান,লজিক,ফিলসোফি,চিকিৎসা বিদ্যা প্রভৃতির ন্যায় সাধারণ বিষয়াদি। এ শিক্ষাব্যবস্থা ও পাঠ্যক্রম প্রচলিত ছিল পুরো ভারতীয় উপমহাদেশে। দরসে নিযামী পাঠ্যক্রম যে সম্পূর্ণত ইসলামী ও সাধারণ শিক্ষার সমন্বয়ে তৈরি ছিল সেটা উপমহাদেশের বরেণ্য ইসলামী পণ্ডিত মুফতি তাকি উসমানি সাহেব (দা:বা:) ১৩৮৭ হিজরী সনে মক্কা মুকাররামাস্থিত জামিয়া আল-মালিক আব্দুল আযী্য বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক শিক্ষা সম্মেলনে তাঁর উপস্থাপিত একটি প্রতিবেদনে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন"এই শিক্ষাব্যবস্থা আরবি জ্ঞান-বিজ্ঞান,তাফসীর,হাদিস,ফিক্বহ,আক্বাঈদ ও কালাম,ফিলসোফি,লজিক,অংক,চিকিৎসা বিদ্যা, বাস্তুবিদ্যা প্রভৃতি সকল বিষয় নিয়েই ছিল। দরসে নিযামী যেহেতু সকল প্রকারের দ্বীনি ও জাগতিক শিক্ষার সমন্বয়ে প্রস্তুতকৃত ছিল তাই এই পাঠ্যক্রমে পড়াশুনা করে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরা কর্মজীবনে যে কোন কর্মাঙ্গনে যোগ্যতার সহিত কর্ম সম্পাদন করতে পারতেন।"(হামারা তালিমী নিযাম,পৃ-৭৪)
ঔপনিবেশিক বানিয়া বৃটিশরা দেশের ক্ষমতা কুক্ষিগত করে এ দেশের জাতিসত্ত্বা তথা মেরুদণ্ড চুরমার করে দিতে ধ্বংস করে দেশের মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থা। তৎসঙ্গে তারা ধ্বংস করে ইসলামী ও সাধারণ শিক্ষার সমন্বিত পাঠ্যক্রম দরসে নিযামী। দেশের মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থার স্থলে স্থাপন করে ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থা। আর দরসে নিযামীর স্থলে প্রবর্তন করে ইসলামী শিক্ষা বর্জিত তথাকথিত আধুনিক পাঠ্যক্রম।
দেশের রাজনৈতিক,অর্থনৈতিক ও শিক্ষা-সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা হারানোর মত কঠিন সময় ও পরিস্থিতিতে দ্বীন ও মিল্লতের জন্য নিবেদিত প্রাণ সংগ্রামী আলেম সমাজ গড়ে তুলেন কৌমি মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থা। অন্যদিকে ইসলামী শিক্ষা বর্জিত ঔপনিবেশিক পাঠ্যক্রমের প্রত্যহ্বানের বিপরীতে দরসে নিযামী পাঠ্যক্রমের সাধারণ শিক্ষা অংশ বাদ দিয়ে কেবল ইসলামী শিক্ষা অংশ অবশিষ্ট রেখে চালু করেন আংশিক দরসে নিযামী পাঠ্যক্রম। আজ এই আংশিক দরসে নিযামীটাই দরসে নিযামী নামে আমাদের কাছে পরিচিত।
এভাবেই বেদনাতুর বিচ্ছেদ ঘটে ইসলামী শিক্ষা ও সাধারণ শিক্ষার ভারতীয় উপমহাদেশে। সেইসঙ্গে মুসলিম সমাজের মধ্যে শিক্ষাকে দ্বীনি ও দুনিয়াবী তথা ধর্মীয় ও জাগতিক এই দুই প্রকারে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠে। চালু হয় দুই ধারার শিক্ষা: দ্বীনি শিক্ষা ও দুনিয়াবি শিক্ষা।
কিন্তু পবিত্র শরিয়তে শিক্ষার মধ্যে সে রকম কোন বিভাজন রেখা টানা হয় নি। ইসলামে উভয় শিক্ষার অবস্থান একেবারে পাশাপাশি,ঘনিষ্ট। একসঙ্গে। আমরা যখন পবিত্র কুরান,হাদিস কিংবা ফিক্বহ শাস্ত্রের বিষয়বস্তুর প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করি তখন তা অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে পরিস্ফুট হয়ে ওঠে। পবিত্র কুরানে তো দ্বীনি দুনিয়াবী সমস্ত বিষয়ের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা রয়েছে তা বলাই বাহুল্য। হাদিসের গ্রন্থাদিতে ইবাদাত বা উপাসনার পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য,কৃষি,সম্পত্তি বণ্ঠন,সমর নীতি,বিয়ে-শাদি ইত্যাদি বিষয় স্থান পেয়েছে সমান গুরুত্বের সহিত। ফিক্বহের উল্লেখ তো আর একেবারে নিষ্প্রয়োজন। হাদিস এবং ফিক্বহের গ্রন্থ সমূহে একই মলাটের ভেতর দ্বীনি এবং দুনিয়াবি বিষয়াদি সন্বিবিষ্ঠ করে দিয়েছেন সম্মানিত মুহাদ্দিস এবং ফক্বিহগণ। সুতরাং আমরা যে বিভাজন রেখা আঁকি সেটা সঠিক নয়। আসলে উভয় প্রকার শিক্ষার সমষ্টিই ইসলামী শিক্ষা। ইসলামী শীক্ষা ও সাধারণ শিক্ষার মধ্যে নেই কোন বিরোধ। দুটা মিলেই পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা।একটাকে বাদ অন্যটা পূর্ণাঙ্গ নয়। তবে সম্মানিত আলিমগণ শিক্ষাকে মানক্বুলাত ও মাক্বুলাত এই দুটি ভাগে বিভক্ত করেছেন। মানক্বুলাত হচ্ছে তা যা ওহী তথা প্রত্যাদেশের মাধ্যমে প্রাপ্ত। যাতে মানুষের অভিজ্ঞতার কোন ভূমিকা নেই। অন্যদিকে মাক্বুলাত হচ্ছে তা যা মানুষের অভিজ্ঞতা লব্ধ। তারপর মাক্বুলাতকে নন্দিত,নিন্দিত, বৈধ বা গ্রহণীয়, বর্জনীয় এবং ঐচ্ছিক ইত্যাদি ভাগে বিভক্ত করেছেন। ইমাম গাজ্জালী (র:) তাঁর অনন্য গ্রন্থ "ইহয়াউ উলুমিদ্দিন"- এ শিক্ষাতাত্ত্বিক আলোচনায় এ বিষয়ে বিস্তারিত লিখেছেন।
শিক্ষা ও শিক্ষাব্যবস্থার এই অসঙ্গত বিভাজন আসলে সামাজিক পতনেরই একটা অনিবার্য পরিণতি। তাই উত্তরণের জন্য এই অনাকাঙ্ক্ষিত বিভাজনী দৃষ্টিভঙ্গির বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে আসা একান্ত প্রয়োজন। ইসলামী ও সাধারণ শিক্ষার সমন্বয় তথা পুনর্মিলন আবশ্যক।
এই চিন্তা ও চেতনা নিয়ে বরাকের কিছু সংখ্যক আলিমে দ্বীন ২০১৮ সালের অক্টোবর মাসের সাত তারিখে এক একান্ত আলোচনা সভায় মিলিত হন কাছাড় জেলার শিলডুবি গ্রামে অবস্থিত দারুস সালাম মাজমাউল বাহরাইন খানক্বায়ে মুছুদ্দরিয়া মাদরাসায়। প্রথম সভায় উপস্থিতদের মধ্যে ছিলেন মাওলানা আবু নাজাত সাইফুল হক্ব,মাওলানা রুহুল আমীন লস্কর,মাওলানা ইক্ববাল হুসাইন লস্কর,মাওলানা বিলাল আহমদ,মাওলানা আব্দুল ওয়াদুদ বড়ভুইয়া ও মাওলানা জয়নাল আবেদীন লস্কর। আলোচনাক্রমে ক্রমান্বয়ে গঠিত হয় "মাজলিস আল-মাদারিস আল-ইসলামিয়া" নামে শিক্ষা মূলক একটা বোর্ড। আর এই বোর্ড কর্তৃক তৈরিকৃত ইসলামী ও সাধারণ শিক্ষার সমন্বিত পাঠ্যক্রম"মানহাজ আল-মাজলিস"-এর উন্মোচন সম্পন্ন হল ১৪ই জানুয়ারী ২০২১ ইংরাজি তারিখে হাইলাকান্দি জেলার আলগাপুর সমষ্টির নয়া সড়ক সংলগ্ন আল-উমারাইন একাডেমিতে এক ঝাঁক বরেণ্য আলিমে দ্বীন, শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবিবৃন্দের উপস্থিতিতে। এই পাঠ্যক্রম ইসলামী শিক্ষা ও সাধারণ শিক্ষার সমন্বয় সাধনের ক্ষেত্রে সফল ভূমিকা পালন করবে বলেই আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস। এখন আমাদের কর্তব্য এ পাঠ্যক্রমের বাস্তবায়ন। মহান আল্লাহ যেন আমাদের এ পাঠক্রম বাস্তবায়নের তাওফীক দান করেন। এটাকে অনুগ্রহ করে এটাকে গ্রহণ করেন।
উল্লেখ্য: আগ্রহীরা হ্যোয়াটস আপ নাম্বার ইনবক্স করে মাজলিসের কারো কাছ থেকে পাঠ্যক্রমের পিডিএফ সংগ্রহ করতে পারেন।