15/03/2026
টানা এক মাস ধরে স্কুলে যায়নি তানিয়া। চাঁদপুরের মেয়ে তানিয়া। বাড়ির সবাই তাকে খুব বিশ্বাস করত। প্রতিদিন সকালে কাঁধে ব্যাগ নিয়ে যখন সে বের হতো, সবাই ভাবত সে স্কুলেই যাচ্ছে। মায়ের চোখে থাকত একবুক স্বপ্ন—মেয়ে বড় হয়ে পরিবারের মুখ উজ্জ্বল করবে। কিন্তু সেই অগাধ বিশ্বাসের আড়ালে যে কত বড় এক প্রতারণা দানা বাঁধছিল, তা ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি কেউ।
বয়ঃসন্ধির এক অদ্ভুত দোলাচল আর নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি তীব্র আকর্ষণ তানিয়াকে ঠেলে দিয়েছিল এক ভুল পথে। স্কুলগেটের সামনে থেকে তার পথ বেঁকে যেত কাছাকাছি থাকা এক পরিচিত ছেলে, সিফাতের ফ্ল্যাটের দিকে। সিফাত কলেজে পড়ত, আর দিনের বেশিরভাগ সময় তার ফ্ল্যাটটা ফাঁকাই থাকত। স্কুলফাঁকি দেওয়া মেয়েটার কাছে ওই ফাঁকা ফ্ল্যাটটা হয়ে উঠেছিল এক অন্য জগত, যেখানে কোনো নিয়ম বা বিধিনিষেধ নেই।
প্রথম দিকে শুধু গল্পগুজব চললেও, ধীরে ধীরে সেই ফ্ল্যাটের পরিবেশ বিষাক্ত হতে শুরু করে। সিফাতের বয়োজ্যেষ্ঠ বখাটে বন্ধুরা আসত সেখানে। ধোঁয়ায় ভরা ঘরে চলত আড্ডা, আর সদ্য কৈশোরে পা দেওয়া তানিয়া নিজেকে তাদের সমকক্ষ ভাবতে শুরু করে। তাদের মুখে শোনা কুরুচিপূর্ণ ভাষা, অশ্লীল জোকস আর হাসাহাসিতে তানিয়াও গা ভাসিয়ে দিত।
স্মার্টফোনে এমন সব সিনেমা বা ভিডিও চলত, যা তার বয়সের জন্য সম্পূর্ণ বেমানান। সিফাতের সঙ্গে তার সম্পর্কটাও গড়িয়েছিল বিপজ্জনক মাত্রায়। সমাজের চোখে যা ঘোরতর অপরাধ, যা একটি মেয়ের জীবন ও তার পরিবারের সম্মানকে মুহূর্তের মধ্যে কালিমালিপ্ত করে দিতে পারে—সেই নিষিদ্ধ খেলাতেই মেতে উঠেছিল সে।
তানিয়ার কি কখনো বিবেক দংশন করত না? করত। প্রতিদিন ওই ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে যখন সে বাড়ির পথ ধরত, বুকে একটা ভারী পাথর চেপে বসত। মায়ের হাসিমুখটা দেখলে ভেতরে ভেতরে অপরাধবোধে কুঁকড়ে যেত সে। রাতের বেলা নিজের ঘরে শুয়ে তার মনে হতো, ধরা পড়লে কী হবে! কিন্তু পরদিন সকালে আবার সেই নিষিদ্ধ জগতের মোহ, সেই 'বড় হয়ে যাওয়ার' মিথ্যে স্বাধীনতা তাকে টেনে নিয়ে যেত। মিথ্যার জালটা এতটাই বড় হয়ে গিয়েছিল যে, সে চাইলেও আর বের হতে পারছিল না।
কিন্তু পাপ কখনো চিরকাল চাপা থাকে না। এক মাস পর এক আত্মীয় হঠাৎ কোনো এক প্রয়োজনে তানিয়াদের স্কুলে যান। কথায় কথায় ক্লাস টিচারের কাছে খোঁজ নিতে গিয়ে তার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে—তানিয়া তো গত এক মাস ধরে স্কুলেই আসছে না! খবরটা বাড়িতে পৌঁছাতেই এক ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। শুরু হয় খোঁজ। বন্ধুদের কাছ থেকে পাওয়া টুকরো তথ্যের সূত্র ধরে সেই আত্মীয় আর তানিয়ার বাবা একবুক আতঙ্ক নিয়ে গিয়ে দাঁড়ান সিফাতের সেই ফ্ল্যাটের দরজায়।
দরজায় কড়া নাড়ার পর বেশ কিছুক্ষণ কোনো সাড়া নেই। চারপাশের দমবন্ধ করা নীরবতা। অবশেষে সিফাত যখন দরজাটা খুলল, পেছনের দৃশ্যটা দেখে তানিয়ার বাবার মনে হলো কেউ যেন তার বুকে নিস্তব্ধে ছুরি চালিয়ে দিয়েছে। ঘরের ভেতর সোফায় জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে তার আদরের মেয়ে। মুহূর্তের জন্য পুরো পৃথিবীটা যেন থমকে গেল। এক অস্বস্তিকর, থমথমে আর লজ্জাজনক পরিস্থিতি। সমাজের কাছে জানাজানি হলে কী হবে, সেই তীব্র ভয়ে উপস্থিত সবাই শিউরে উঠল।
সে দিন কোনো চিৎকার-চেঁচামেচি হয়নি, মারধরও হয়নি। রাতে খাওয়ার টেবিলে এক অদ্ভুত, ভারী নিস্তব্ধতা ছিল। বাবা শুধু একটা কথাই বলেছিলেন, "যে বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে আমরা তোকে নিয়ে স্বপ্ন দেখি, তুই আজ সেই ভিত্তিটাই ভেঙে দিয়েছিস মা।" বাবার সেই অশ্রুসজল চোখ আর মায়ের নিশ্চুপ কান্না তানিয়ার ভেতরে থাকা সত্তাটাকে প্রবলভাবে নাড়িয়ে দিল। সে বুঝতে পারল, ক্ষণিকের এই মিথ্যে আনন্দ আর উচ্ছৃঙ্খলতা আসলে এক অন্ধকারের চোরাবালি, যা তাকে ধ্বংসের দিকে টানছিল।
সেই রাতটা তানিয়ার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সেদিনের সেই অস্বস্তিকর আর লজ্জাজনক ঘটনাই তার জন্য জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়ে দাঁড়ায়। সে প্রতিজ্ঞা করে, আর কোনো লুকোচুরি নয়, নিষিদ্ধ পথের মোহ নয়। পরিবারের হারানো বিশ্বাস ফেরানো আর নিজের পড়াশোনাকেই সে জীবনের একমাত্র লক্ষ্য বানাবে।
🌸 গল্পটি ভালো লাগলে অবশ্যই শেয়ার করুন! এমন বাস্তব, হৃদয়ছোঁয়া ও অনুপ্রেরণামূলক গল্প নিয়মিত পেতে আমাদের পেজটি ফলো দিয়ে পাশে থাকুন। ⭐ আপনার একটি স্টার আমাদের জন্য বড় অনুপ্রেরণা।