27/10/2023
স্কুটারের কিছু সাধারণ সমস্যা এবং তার প্রতিকার; যা আপনার জানা উচিত।।
স্কুটার প্রেমিক হিসেবে আজকে আমি আপনাদের কাছে কিছু স্কুটারের সমস্যা এবং প্রতিকারের কিছু গুরুত্বপূর্ন টিপস তুলে ধরলাম । কিছু কমন সমস্যা যেগুলো আমরা প্রতিদিন সম্মুখীন হই এবং যেগুলোর প্রতিকার আমরা করতে চাই । অনেকেই ভাবেন স্কুটারের সমস্যা গুলো জটিল । আসলে এমন নয় । আপনি খুব সহজে এই সমস্যা গুলোর সমাধান করতে পারবেন । স্কুটারের সমস্যা গুলো যা সাধারণ সেগুলো হলঃ
**১. ইঞ্জিন হল্টিং:: **
সবাই হয়ত জানেন একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যদি স্কুটার না চালানো হয় তাহলে ইঞ্জিন সহজে চালু হতে চায় না । এর পিছনে অনেক কারণ রয়েছে। সবথেকে বড় কারণ হল ইঞ্জিন চালু হওয়ার সময় পরিমিত পরিমানে ফুয়েল পায় না।
এক্ষেত্রে চোক আপনাকে স্টার্ট করতে সহায়তা করবে । তারপরেও যদি একই ধরনের সমস্যা দেখা দেয় তাহলে আপনার ফুয়েল লাইন চেক করে দেখতে হবে। আর একটি কারণ হল, খারাপ মানের ফুয়েল যেটি আমরা সবাই এই সমস্যাটিতে ভুগছি । যদি সেখানেও কোন সমস্যা না থাকে তাহলে স্পার্ক প্লাগ চেক করুন দেখুন স্পার্ক প্লাগ এর অবস্থা কেমন এবং ইঞ্জিন চালু হওয়ার জন্য পর্যাপ্ত পরিমানে স্পার্ক পাচ্ছে কি না । যদি তাও চালু না হয় তাহলে দুঃখের বিষয় হল যে আপনার বাইকের ম্যাগনেট কয়েল, ইগ্নিশন কয়েল বা ইঞ্জিনে কোন সমস্যা আছে যেটি শুধু মেকানিকের মাধ্যমে ঠিক করা যাবে।
যদি স্কুটার রাইডিং এর সময় ইঞ্জিন হল্ট হয় তাহলে স্কুটারটি নিয়ে আপনি রাস্তার এক পাশে নিরাপদে ডাবল স্ট্যান্ড করে নেন । এরপর লক্ষ্য করুন যে, আপনার ফুয়েল লাইন ঠিক আছে কি না। যদি আপনি কম সিসি এর স্কুটার হাই স্পিডে রাইডিং করেন, তাহলে আপনার উচিত স্কুটারটির ইঞ্জিনকে কিছুক্ষণ এর জন্য ঠান্ডা হওয়ার জন্য সময় দেয়া। অথবা সিডিআই থেকে ইগনিশন তারপর ইগনিশন কয়েল থেকে স্পার্ক প্লাগে পর্যাপ্ত পরিমাণে বিদ্যুৎ পাচ্ছে কি না তা চেক করতে হবে। অনেক সময় সামান্য লুজ কানেকশন এর ফলেও বিদ্যুৎ প্রবাহ বিঘ্নিত হতে পারে। তার ফলে হঠাৎ করেই স্কুটার চলন্ত অবস্থায় বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তাই কানেকশনগুলো ভালো সেঁটে লাগাবেন। মাঝে মধ্যেই এই চেকটি করবেন।
**২. ভাল থ্রোটল রেস্পপন্স না পাওয়া:: **
যদি আপনি থ্রোটল রেস্পপন্স ভাল ভাবে না পান তাহলে কিছু জিনিস চেক করতে পারেন । আপনার সবার আগে যে কাজটি করতে হবে তা হল বাইকের কার্বোরেটর টিউনিং এবং ইঞ্জিন টিউনিং (ট্যাপিড + টাইমিং চেইন) ঠিক আছে কি না। এছাড়া এয়ার ফিল্টার, ফুয়েল ফিল্টার, ইগ্নিশিন কয়েল এবং স্পার্ক প্লাগ চেক করুন । যদি তারপরেও একই ধরনের সমস্যা হয় তাহলে ফুয়েলের কোয়ালিটি কেমন সেটি চেক করুন ।
আরো বেশি পর্যবেক্ষণের এর জন্য আপনি স্পার্ক প্লাগ + সিডিআই +
ম্যাগনেট কয়েল চেক করে দেখবেন যে এগুলো সঠিক পরিমানে বিদ্যুৎ সরবরাহ দিচ্ছে কি না । আপনি আপনার স্কুটারের এক্সিলেরশন ক্যাবল চেক করে দেখতে পারেন। আমরা প্রায় এটি ভুলে যাই কিন্তু বাইরের বাতাস এবং আদ্রতার জন্য ক্যাবল এর ভিতরে মরিচা ধরতে পারে । এছাড়া আপনি স্কুটারের **CVT System (Continuously Variable Transmission)** ঠিক আছে কি না সেটিও চেক করে দেখতে পারেন । রোলার ওয়েট ক্ষয় হয়ে গেলে বা বেল্টে কোন সমস্যা হলেও থ্রটল রেসপন্স কমে যায়। **বেল্ট ছিড়ে গেলে চেঞ্জ করতে হবে সেটা মাথা থেকে বের করে দিন। নির্দিষ্ট সময় এর আগেই বেল্ট পাল্টে ফেলুন।** এতে থ্রটল রেসপন্স ভালো পাবেন।
**৩. ব্রেকিং সমস্যা:: **
দুই চাকার স্কুটারের জন্য এই ব্রেকিং বিষয়টি সব থেকে বেশি গুরত্বপূর্ন জিনিস ।** ”আমাদের মনে রাখা উচিত যে, কত স্পিডে স্কুটার চালাচ্ছি সেটি মূখ্য বিষয় নয় বরং কত সুন্দরভাবে ব্রেক করে বাহন থামাতে পারবো সেটিই হল মুখ্য বিষয়।”** আমাদের দেশে দুই ধরনের ব্রেক রয়েছে স্কুটারের জন্য। একটি হল ড্রাম ব্রেক এবং আর একটি হল ডিস্ক ব্রেক যেটি হাইড্রোলিক ফুয়েল এর মাধ্যমে কন্ট্রোল করা হয় । প্রথমে ড্রাম ব্রেক নিয়ে কথা বলি । যদি আপনি ব্রেকিং সিস্টেম এ কোন ধরনের সমস্যা ফেস করেন তাহলে ব্রেকের ক্যাবলটি লক্ষ্য করুন ।
যদি ক্যাবলটি পুরাতন হয়ে যাওয়ার আগেই চেঞ্জ করে ফেলুন । হয়ত ক্যাবলের ভিতরে মরিচা ধরে গেছে যার কারনে ভাল ভাবে ব্রেক কাজ করছে না । যদি আপনি ড্রাম ব্রেক ব্যবহারকৃত স্কুটার ব্যবহার করে থাকেন তাহলে আমার মতে যতটা পারেন কম এগ্রেসিভ ভাবে রাইডিং করবেন। অতিরিক্ত ব্রেকিং এর ফলে প্যাড গরম বেশি হবে এবং প্রশস্ত হবে যার ফলে ব্রেক দূর্বল হয়ে পড়বে ।
ডিস্ক ব্রেকে সবার আগে আপনি যে জিনিসটি চেক করবেন তা হল হাইড্রোলিক অয়েল ভালভাবে ব্রেক ক্যালিপারে পৌছাচ্ছে কি না । শুধুমাত্র সেই অয়েল ব্যবহার করুন যেটি স্কুটার কোম্পানি থেকে বলে দেওয়া হয়েছে । লিভারস পাশে যে বাকেট আছে সেটিও চেক করে দেখুন। ব্রেক-সু প্রতিদিন চেক করে দেখুন। ক্ষয়ে গেলে পাল্টে ফেলুন। স্কুটারের বল-রেসার ঢিলে হয়ে গেলে টাইট করিয়ে নিন বা পাল্টে নিন। কারণ, বল-রেসার ঢিলে থাকলেও ভালো ব্রেকিং পাবেন না।
**৪. ইলেক্ট্রিক্যাল সমস্যা ::**
বর্তমানে স্কুটারের জন্য এটি সাধারণ সমস্যা হলেও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। একটি ইলেক্ট্রিক্যাল সমস্যা স্কুটারের জন্য বিভিন্ন ধরনের নতুন সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। ইন্ডিকেটর লাইট থেকে ইঞ্জিন এর হল্টিং সব সমস্যা প্রধানত এই কারণে হয়ে থাকে । এই সমস্যা দূর করার জন্য হয়তো আপনাকে যে কোন ইলেক্ট্রিক ওয়্যার বা তার কাটতে হতে পারে কিন্তু ওয়্যার কাটার সময় খেয়াল রাখবেন যে আপনি সঠিক তার কাটছেন কিনা। কারণ ভুল কানেকশন এর তার কাটলে বা জোড়া দিলে আপনার স্কুটারে আগুনে লেগে যেতে পারে ।
**অবশ্যই মনে রাখবেন, তার কাটার পর মুড়িয়ে জয়েন্ট না করে সোল্ডারিং করে ভালভাবে টেপিং করবেন।** আপনার স্কুটারের ব্যাটারি মাঝে মধ্যে চেক করে দেখুন । স্কুটারের ইগ্নিশন কয়েল ঠিকভাবে কাজ করছে কি না তা চেক করতে ভুলবেন না। কারণ, এটি আপনার স্কুটারের পার্ফমেন্স, থ্রোটল রেস্পন্স এবং মাইলেজের বিষয়ে বিরাট বড় ভূমিকা পালন রাখে । একটি কথা অবশ্যই মনে রাখবেন, **আপনি যদি মেকানিক এর কাছে ওয়্যার বা তারের সমস্যা নিয়ে যান তাহলে অবশ্যই রাতে যাবেন না ।** দিনের বেলায় কাজ করাবেন যাতে মেকানিক বুঝতে পারে সঠিক তারে কাজ করছে কি না।
**৫. জার্কিং এবং ভাইব্রেশন সমস্যা ::**
প্রায় সব স্কুটারে কিছুটা হলেও ভাইব্রেশন হয়। যদি আপনার স্কুটারে বেশি পরিমান ভাইব্রেশন হয় তাহলে অবশ্যই আপনি কিছু জিনিস খেয়াল করতে হবে। অতিরিক্ত ভাইব্রেশন এর কারণে রাইডিং ক্যাপাবিলিটিতে সমস্যা দেখা দেয় । সর্বপ্রথম আপনি যে জিনিসটি খেয়াল করবেন তা হল যে আপনার বাইকের বডি পার্টস গুলো ভালভাবে জয়েন্ট আছে কিনা, যদি ফুল কিটেড স্কুটার হয় ।
আপনার স্কুটারের ফ্রন্ট সাস্পেনশন এবং রেয়ার শক এব্জার্বার ঠিক আছে কি না সেটাও চেক করা প্রয়োজন। এছাড়াও **CVT System (Continuously Variable Transmission) এর বেল্ট, ভেরিয়েটরের রোলার ওয়েট চেক করতে হবে**। স্কুটারের CVT System এর ভেরিয়েটরের রোলার ওয়েট ক্ষয়ে গেলে ভাইব্রেশন বেশি হয়।
**৬. বেশি ফুয়েল খরচ হওয়া :: **
ফুয়েল বেশি খরচ হওয়াটা আমাদের জন্য সব থেকে বড় মাথা ব্যাথার বিষয় । সর্বপ্রথম হল আপনি কেমনভাবে স্কুটার রাইড করেন । মোটামুটি ভাবে ৪০০০ - ৬০০০ RPM মেনে নির্দিষ্ট স্পিডে রাইডিং এর ফলে মাইলেজ বেশি পাবেন। সঠিক সময় ইঞ্জিন অয়েল চেঞ্জ করলে ভাল মাইলেজ পাওয়া যায় । কার্বোরেটর এর টিউনিংও বেশ গুরুত্বপূর্ন বিষয় ।
এছাড়া CVT System চেক করে দেখা উচিত । ফুয়েল কম খরচ হওয়ার বিষয়ে রোলার ওয়েট এখানে সব থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রাখে। চাকার রেডিয়াসে কম এয়ার প্রেশার ফুয়েল খরচ আরো বাড়িয়ে দেয়। তাই সঠিক ট্যায়ার প্রেশার রাখা দরকার। CVT System এর বেল্ট দৈর্ঘ্যে বৃদ্ধি পেলে, ব্রেক সু সমস্যা, ড্রাম ব্রেক সমস্যা, বিয়ারিং এই সমস্যাগুলো চাকা জ্যাম করে রাখতে পারে। তাই খেয়াল রাখতে হবে।
পরিশেষে, কিছু পার্টস সর্বদা শেষ হবার, ছিড়ে যাবার, ভেঙ্গে যাবার, শুকিয়ে যাবার অথবা কার্যক্ষমতা লোপ পাবার পূর্বেই পরিবর্তন করে ফেলবেন। যাতে করে চলন্ত অবস্থায় অনাকাঙ্খিত ঝামেলায় পড়তে না হয়।
**পার্টসগুলো হলো: ব্রেক প্যাড বা সু, থ্রোটল ক্যাবল, ট্যায়ার জেল, CVT System এর বেল্ট, রোলার ওয়েট, রেয়ার ক্লাচের ক্লাচ-সু, গিয়ার ওয়েল, চাকার বিয়ারিং, ট্যায়ার ইত্যাদি। **
তারসাথে, নিয়মিত সার্ভিসিং করাতে হবে। হাতে সময় থাকলে অবশ্যই সার্ভিসের সময় নিজে উপস্থিত থেকে সার্ভিস করাবেন। এতে বিপদের সময় আপনার অর্জিত অভিজ্ঞতা কাজে আসবে।
আপনার রাইডিং নিরাপদ এবং আরামদায়ক হোক।
ধন্যবাদ।