05/09/2026
ওয়াজ মাহফিল হোক তরুণ প্রজন্মের আত্মশুদ্ধি ও পথনির্দেশের মঞ্চ
বর্তমান সময়ে ওয়াজ মাহফিল শুধু ধর্মীয় আলোচনা নয়, বরং তরুণ প্রজন্মের চিন্তা, চরিত্র ও জীবনদর্শন গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হতে পারে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে অনেক মাহফিলেই গভীর ইলম, আত্মশুদ্ধি ও চরিত্র গঠনের আলোচনার পরিবর্তে অতিরিক্ত হাস্যরস, চটকদার বক্তব্য এবং ভাইরাল হওয়ার প্রবণতা বেশি দৃশ্যমান। এর ফলে ওয়াজের মূল উদ্দেশ্য অনেক সময় আড়ালে পড়ে যায়।
ঠিক এই জায়গাতেই ব্যতিক্রমী এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন আলহাজ্ব ড.মাওলানা সাইফুল আজম বাবর আজহারী ছাহেব।
ঐতিহাসিক ১৯ দিনব্যাপী ৫৬তম আন্তর্জাতিক সীরাতুন্নবী (ﷺ) মাহফিলের ১১তম দিবসে “মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বিশ্বনবী ও সার্বজনীন আদর্শ” বিষয়কে কেন্দ্র করে তাঁর প্রায় ২ ঘণ্টার দীর্ঘ ওয়াজ ছিল গভীর ইলম, চিন্তা ও হৃদয়স্পর্শী নসিহতে পরিপূর্ণ।
এই দীর্ঘ আলোচনায় তরুণ প্রজন্মের মনোজগতকে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছেন। রঙ্গমঞ্চ ও বিনোদনের এই যুগে একজন তরুণের ঈমান, আকিদা, চরিত্র ও জীবনকে কীভাবে সঠিক পথে পরিচালিত করা যায়, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি হুব্ব ও মহব্বত কীভাবে অন্তরে ধারণ করতে হয়, তাঁর সুন্নাহ ও আদর্শ কীভাবে ব্যক্তিজীবনে বাস্তবায়ন করতে হয় এবং উম্মাহ কীভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দ্বীনের জন্য কাজ করতে পারে, এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তিনি কুরআন, হাদীস ও বিজ্ঞানের আলোকে বিশদভাবে তুলে ধরেছেন।
সবচেয়ে প্রশংসনীয় বিষয় হলো, এই দীর্ঘ সময়ের আলোচনায় অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা দিয়ে সময় নষ্ট করার প্রবণতা ছিল না। বরং প্রতিটি মুহূর্তকে তিনি ইলম, নসিহত ও রাসুলপ্রেমের বার্তা মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে দেওয়ার কাজে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছেন। একজন শ্রোতা হিসেবে এমন একটি ওয়াজ শুনলে উপলব্ধি করা যায়, দীর্ঘ সময় কথা বলাই বড় বিষয় নয়, বরং সেই সময়টুকু কতটা অর্থবহ ও উপকারী করে তোলা যায় সেটিই আসল।
কারণ শুধু ইলম থাকলেই একজন আলেমের পূর্ণতা আসে না। ইলমের সঙ্গে থাকতে হয় আদব, আখলাক, আমল, খুলুসিয়ত এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি গভীর ইশক ও মহব্বত। ইলম যখন আদব ও আমলের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখনই তা মানুষের হৃদয় পরিবর্তনের শক্তি অর্জন করে।
আজ আমাদের ওয়াজ মাহফিলগুলোর দিকে তাকালে তাই একটি প্রশ্ন সামনে আসে: আমরা কি তরুণ প্রজন্মকে সত্যিই কিছু শেখাতে পারছি?
অবশ্যই বিনোদন বা হাস্যরসের নিজস্ব একটি জায়গা আছে। কিন্তু যখন ওয়াজের মূল উদ্দেশ্যকে ছাপিয়ে সেটিই প্রধান আকর্ষণে পরিণত হয়, তখন শ্রোতা হয়তো কিছু সময় হাসে, হাততালি দেয়, ভিডিও ধারণ করে কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করে, কিন্তু তার জীবন কতটা পরিবর্তিত হলো, সেটিই হওয়া উচিত আমাদের মূল বিবেচনা।
দুঃখজনকভাবে, অনেক ক্ষেত্রে গভীর ইলম ও তাকওয়াসম্পন্ন আলেমদের পরিবর্তে এমন বক্তাদের বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, যাদের বক্তব্যের প্রধান লক্ষ্য হয়ে ওঠে জনপ্রিয়তা, ভাইরাল হওয়া কিংবা শ্রোতাদের তাৎক্ষণিক বিনোদন দেওয়া। এর ফলে তরুণরা ওয়াজ শুনছে ঠিকই, কিন্তু প্রয়োজনীয় জ্ঞান, আদর্শ ও জীবনঘনিষ্ঠ দিকনির্দেশনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
ওয়াজ মাহফিল কোনো রঙ্গমঞ্চ নয়। এটি মানুষের হৃদয় জাগানোর জায়গা।
এটি এমন একটি মঞ্চ, যেখান থেকে একজন তরুণ তার জীবন বদলে দেওয়ার মতো একটি কথা শুনতে পারে, একজন গুনাহগার তওবার পথে ফিরতে পারে, একজন হতাশ মানুষ আশার আলো খুঁজে পেতে পারে এবং একজন মুসলমান রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শকে নতুন করে নিজের জীবনে ধারণ করার প্রেরণা পেতে পারে।
তাই আমাদের ওয়াজ মাহফিলগুলোতে ইলম, হিকমাহ, আদব, আখলাক, আমল ও হুব্বে রাসুলের চর্চা আরও বাড়ানো প্রয়োজন। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে সামনে রেখে এমন আলেমদের বক্তব্যের সুযোগ করে দেওয়া প্রয়োজন, যারা শুধু কথা বলতে জানেন না, বরং নিজের জীবনেও ইলম, আমল ও আদর্শের প্রতিফলন ঘটান।
সাইফুল আজম বাবর আজহারী ছাহেবের এই আলোচনা সেই প্রয়োজনের কথাই যেন নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়।
রাব্বে কারীম আলহাজ্ব ড.মাওলানা সাইফুল আজম বাবর আজহারী ছাহেবকে হায়াতে তৈয়েবা দান করুন, তাঁর ইলম, আমল ও খেদমতে বরকত দান করুন এবং তাঁর মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মসহ সমগ্র উম্মাহকে উপকৃত করুন।
আমিন, ইয়া রব্বাল আলামিন।
Mohammed Shaiful Azam Al-Azhary
ঐতিহাসিক ১৯ দিনব্যাপী ৫৬তম আন্তর্জাতিক সীরতুন্নবী (সঃ) মাহফিল ১১তম ...