06/04/2016
বাংলাদেশের বেশিরভাগ সরকারী অফিস ভয়ংকর দুর্নীতির আখড়া। তবে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিপরায়ন বোধহয় ল্যান্ড অফিসগুলো(উপজেলা ভূমি অফিস) অবশ্য যখন যেই সরকারি অফিসে যাই, তখন সেই অফিসকেই মনে হয় সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিপরায়ন । প্রতি টেবিল থেকে টেবিলে মুঠো মুঠো টাকা ছড়িয়েও মাঝে মাঝে লাভ হয় না।আর ঘুষ ছাড়া কোন জমির রেজিস্ট্রি তো বহুদূরের কথা!
কয়েকদিন আগে এক জমিসংক্রান্ত ঝামেলায় সিলেট উপজেলা ভূমি অফিসে যেতে হলো।টাকাপয়সা নিয়ে প্রস্তুত হয়েই গেছি। গিয়েই শুনলাম,দায়িত্বরত প্রধান কর্মকর্তা এ সি ল্যান্ড সাহেব নেই। প্রধানমন্ত্রী সিলেট আসবেন, তার আয়োজনে গিয়েছেন।দু-তিন দিন এভাবে নানা ঝামেলায় ব্যস্ত রইলেন তিনি, শেষমেষ একদিন সন্ধ্যার পর আসতে বললেন। এর মাঝে যে দু-তিনবার গিয়ে আমি অফিসটার প্রেমে পড়ে গেলাম। বাংলাদেশের কোন সরকারী অফিস এতোটা ঝকঝকে তকতকে পরিস্কার আর সুন্দর পরিপাটি করে গোছানো হতে পারে, চোখে না দেখলে বিশ্বাস করতাম না।এরমধ্যেই আমাকে সবাই জানিয়ে দিয়েছেন একটা বড় অংকের টাকা যেন যোগাড় করে রাখি, দুতিনবার ইনসপেকশনে যাবে, সেখানে টাকা দিতে হবে, টেবিলে টেবিলে আলাদা করে দিতে হবে আর সবার শেষে প্রধান কর্মকর্তাকে তো একটা বড় অংকের ঘুষ দেওয়া ফরজ।যদ্মিন দেশে যদাচার!
তো নির্ধারিত দিনে এ সি ল্যান্ড জনাব সোহেল মাহমুদের সাথে দেখা হলো। আমি আমার মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় দিলাম, তখনই এক বিচিত্র ব্যাপার ঘটলো।অফিসার ভদ্রলোক অভিভূত হয়ে গেলেন। বারবার বলতে লাগলেন, "আজকে আমি ধন্য হয়েছি একজন মুক্তিযুদ্ধা এসেছেন আমার অফিসে" তারপর উনি যে ভাবে সবাইর সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন এবং আপ্যায়ন করলেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না।। হঠাৎ মনে হলো, মুক্তিযুদ্ধ করে হয়তো ভুল কিছু করিনি। মনে পড়ে গেল ৭৫ রের পরের বাংলাদেশের কথা। সেসময় তো এই দেশে মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় দেওয়াই ভয়ংকর অপরাধ ছিল!
তো এ সি ল্যান্ড ভদ্রলোক বারবার করে বললেন,",আপনাকে আর আসতে হবে না।জমিতে কোন সমস্যা না থাকলে কাজটা আমি নিজ দায়িত্বে করে দেবো।" এখন জমিটা আমার পৈতৃক সম্পত্তি, অন্য কোন সমস্যা থাকার প্রশ্নই ওঠে না, সুতরাং আমি নিশ্চিত মনে কৃতজ্ঞ চিত্তেই ঢাকা ফিরে এলাম। নাটকের শুরু হলো তখনই।
ঢাকা ফিরে শুনি এ সি ল্যান্ড সাহেব নাকি জানিয়েছেন, তিনি কাজটা করতে পারবেন না। ডিসি অফিসে পাঠিয়ে দেবেন। ডিসি অফিসে যাওয়া মানে আরো কতগুলো টেবিলে ফাইল ঘোরা, আরো চার-পাঁচবার আমাকে সিলেট ঘুরতে হবে, দ্বিগুণ ঘুষ নেওয়ার আয়োজন... শুনে খুব অবাক লাগলো। এই লোকটাই সেদিন আমার মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় পেয়ে কতটা উচ্ছ্বসিত হয়েছিলেন, তার অফিসের সবার সাথে কি গর্বের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, আমার কাজটা যেন সবার আগে শেষ হয়। যাকে দেখে ভেবেছিলাম, না, এখনো সব নষ্টের অধিকারে চলে যায়নি, সেই মানুষটা এরকম করবে? মানতে পারছিলাম না। খারাপ লাগলো খুব।
ঠিক সে মুহূর্তে একটা ফোন এল। রিসিভ করতেই শুনি সেই এ সি ল্যান্ড। আমি তো তার গলা শুনেই ভেবে নিলাম, মিনিমাম কয়েক লাখ তো লাগবেই।আগের রাতে আমার সোর্সের মাধ্যমে টাকা পাঠিয়েছি, আরো লাগলে আরো পাঠাতে হবে। কয়েক লাখে যদি তাকে সন্তুষ্ট করা যায়, তবে বাঁচোয়া। নইলে ডিসি অফিসের দালালদের কত টাকার ধাক্কা কে যানে । আমার ভাবনার জাল হঠাৎ ছিন্ন হয়ে গেল সোহেল সাহেবের কথায়।
"ভাই, আপনার নাম্বারটা আমি বহু খুঁজেছি, অনেক কষ্টে ম্যানেজ করতে পারলাম। আপনি আমার ফোন ধরেছেন, থ্যাংক ইউ ভেরি মাচ। আপনাকে একটা কথা বলতে ভুলে গেছি। আমি কিন্তু আপনার কাজটা করে দিয়েছি। ফোন দিতাম না, কিন্তু হঠাৎ মনে হলো ভূমি অফিসের কাজ করে দেওয়ার নামে অনেকেই টাকা পয়সা নেয়, তাই আপনাকে জানিয়ে রাখি যেন আপনি এমন কাউকে টাকা না দেন।আমি আমার দায়িত্ব পালন করতে কোন টাকা নেই না। আপনার জন্যই যদি এই সামান্য কাজটুকু করতে না পারলাম, তবে আর কি করলাম জীবনে?"
আমি অবাক হয়ে গেলাম। আগের রাতেই আমাকে জানানো হয়েছে, যদি টাকা না দেই, তবে ফাইল চলে যাবে ডিসি অফিসে, আরো তিন মাস দেরি হবে, টাকাও লাগবে অনেক বেশি। ফোনের অপ্রান্তে সোহেল সাহেব তখনো জিজ্ঞেস করছেন, আপনার কাছে কেউ টাকা চায়নি তো?" আমি তখন বলতে বাধ্য হলাম, "আপনার নাম করে আমার কাছে টাকা চাওয়া হয়েছে এবং আমি সে টাকা পাঠিয়েও দিয়েছি।"উনি তখন বললেন, "প্লিজ যাকেই দিয়েছেন, ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করুন । আমি বা আমার অফিসের কেউ কোন টাকা নেই না।আপনার কোন লোক পাঠিয়ে দিন, সে এসে খাজনা দিয়ে কাগজপত্রগুলো নিয়ে যাবে।"
অবাক বিস্ময়ে কথাগুলো শুনতে শুনতে ভাবছিলাম, এখনো এমন মানুষ আছে? এখনো এমন সরকারী কর্মকর্তারা আছে? অন্যায়ই যেখানে স্বাভাবিক, ক্ষেত্রবিশেষে বাধ্যতামূলক, সেখানে শত প্রলোভন উপেক্ষা করে এখনো এমন বিসিএস ক্যাডাররা স্রেফ জনগনের সেবায় নিজেদের নিয়োজিত রাখছেন অহনির্শ? বাহ!
সোহেল মাহমুদ, আপনাকে স্যালুট, অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে শ্রদ্ধা... আপনাদের মত কিছু পর্দার আড়ালের আছেন বলেই এখনো সবকিছু ভেঙ্গে পড়েনি..
রুহেল আহমেদ
সাব সেকটার কমান্ডার
Sector 4. Sub S. 4
সংযুক্তি ১ঃ ভূমি সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে সিলেট উপজেলা ভূমি অফিসের এসিল্যান্ড সোহেল মাহমুদের অসাধারন উদ্যোগে তৈরি সেবাকুঠিরঃ http://bangla.bdnews24.com/samagraba…/article1087538.bdnews…
সংযুক্তিঃ২ তার সেবাকুঠির নিয়ে ইনডিপেন্ডেন্ট টিভির প্রতিবেদনঃ https://www.facebook.com/sohel.mahamud3/videos/1082471761808842/?pnref=story
সংযুক্তিঃ৩- সেবাকুঠিরের ছবিঃ https://www.facebook.com/sohel.mahamud3/posts/1122417927814225?pnref=story
সংযুক্তিঃ৪ আমার কিছু ছবি নিয়ে একটা কোলাজঃ
https://youtu.be/AOlZA33QQoE