29/05/2021
Mitsubishi PAJERO a legacy ❤
একটা টাইম ছিলো, যখন পাজেরো গাড়িটি ছিলো এখনকার প্রাডোর মতো একটি স্ট্যাটাস সিম্বল। “সে পাজেরো জীপে চড়ে” কথাটি ছিলো বাংলাদেশে বড়লোক কাউকে চেনানোর একটি বড় মাধ্যম। কিভাবে এই স্ট্যাটাস তৈরি হলো? মিতসুবিশি পাজেরো-এর যাত্রা শুরু হয় অনেক আগে থেকে, সেই ১৯৫৩ সালে। তখন মিতসুবিশি কোম্পানি আমেরিকার উইলিস-এর সাথে একটি ডিল করে, যেই চুক্তির মাধ্যমে জাপানে উইলিস কোম্পানির জীপ মডেলের (যেটা আজকের জীপ র্যাংগ্লারের আদি-মডেল) প্রোডাকশন শুরু করে মিতসুবিশি। জীপ সিজে-৩ গাড়িটি জাপানে তখন বিক্রি হতো মিতসুবিশি জীপ নামে। পাকিস্তান আমলে জাপান থেকে এই গাড়িগুলো বাংলাদেশে আসা শুরু করে, ও উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তারা এই গাড়িটি ব্যাবহার শুরু করেন। গাড়িটির সামনে থাকতো মিতসুবিশির লোগো, এবং বনেটের সাইডে লেখা থাকতো ‘Jeep’। ব্যাস, বাংলাদেশিদের কাছে এসইউভি টার্মটাই বদলে হয়ে গেলো 'জীপগাড়ি'। তো এরপর ১৯৮১ সালে মিতসুবিশি জীপের প্রোডাকশন বন্ধ হয়ে যখন সেই জায়গায় মিতসুবিশি নিয়ে এলো পাজেরো গাড়িটিকে, এটাকেও বাংলাদেশিরা বলা শুরু করলো 'পাজেরো জীপ'। এই পাজেরো গাড়িটি তখনো প্রথমে সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের দেওয়া হতো, যার মাধ্যমে একটা স্ট্যাটাস তৈরি হয়ে যায় এই গাড়িটি নিয়ে। তাদেরকে ফলো করে তখনকার বিত্তশালী ব্যাক্তিবর্গও কেনা শুরু করলো পাজেরো। বাইরের দেশেও পাজেরোর একটা অন্যরকম ক্লাস আছে, কারণ এই গাড়িটি দুনিয়ার অন্যতম কঠিন র্যালি রেস “ডাকার র্যালি”-তে সর্বকালের সবচেয়ে বেশিবার বিজয়ী।
এবার আসুন আমরা জেনে নেই পাজেরোর শেষ জেনারেশনের কিছু বিস্তারিত। প্রথমে ল্যান্ড ক্রুজার ও নিসান প্যাট্রোলের সাথে ফাইট দেওয়ার জন্য বাজারে আসলেও পরে যেই হারে এলসি আর প্যাট্রোলের সাইজ বাড়তে থাকে, সেদিকে না গিয়ে ছোট সাইজের দিকে থেকে যায় পাজেরো, প্রতিপক্ষ হিসেবে বেছে নেয় এলসি প্রাডোকে। তো সাইজটা নাহয় প্রাডোর সাথেই তুলনা করে বলি। পাজেরোর হুইলবেজ (সামনের চাকাজোড়া আর পিছনের চাকাজোড়ার মধ্যে যতটুকু গ্যাপ) প্রাডোর চেয়ে ১০ মিমি কম, যার কারণে পাজেরোর টার্নিং রেডিয়াস কম ও ম্যানুভারেবিলিটি বেশি, অর্থাৎ প্রাডোর চেয়ে বেশি সহজে টার্ন নিতে পারে পাজেরো। কিন্তু এর মানে প্রাডোর চেয়ে পাজেরোতে লেগরুমও ১০ মিমি কম। কিন্তু এরপরও যা লেগরুম সেটা যথেষ্ট, কারণ এই গাড়িগুলো এমনিই অনেক বড়। প্রস্থেও প্রাডো ১০ মিমি চওড়া, যার কারণে চিপা জায়গা থেকে কেটে বেরোতে গেলে প্রাডোর চেয়ে পাজেরো সহজে বের হতে পারবে, কারন কিঞ্চিত হলেও পাজেরো চিকন। উচ্চতায় আবার সমানে সমান পাজেরো আর প্রাডো -> ১৮৯০ মিমি। ভিতরের স্পেসের ক্ষেত্রে পাজেরোর ভিতরে অনেক জায়গা থাকবে সেটা বলাই বাহুল্য, কারণ এটা একটি ফুল-সাইজড এসইউভি। পাজেরো গাড়িটির সবচেয়ে অসাধারণ দিক হচ্ছে এর চ্যাসিস ও বডিটি। প্রাডো, ল্যান্ড ক্রুজার, নিসান প্যাট্রোল এই গাড়িগুলোতে থাকে বডি-অন-ফ্রেম স্ট্রাকচার, যেটি হচ্ছে একটা ল্যাডার চ্যাসিসের উপর নাট-বল্টু দ্বারা সম্পূর্ণ বডি সেঁটে দেওয়া। এই জিনিসটি অফ-রোডের জন্য ভালো হলেও অন-রোডে বেশি কমফোর্টেবল না, কমফোর্টেবল করার জন্য অনেক জটিল সাস্পেনশন সিস্টেম এবং সাউন্ড ইনসুলেশন বা ক্যান্সেলেশন সিস্টেম দরকার। কিন্তু পাজেরো এখানে একটা দিক থেকে এগিয়ে আছে। লাস্ট জেনারেশন পাজেরোতে আছে ল্যাডার ফ্রেমের সাথে অ্যাটাচ করা একটি মনোকোক বডি। মানে জিনিসটা সাধারণ গাড়ি যেই কারণে বেশি কমফোর্টেবল হয়, সেই জিনিস তারা জুড়ে দিয়েছে অফ-রোডের জন্য ভালো ল্যাডার ফ্রেমের সাথে -> বেস্ট অফ বোথ ওয়ার্ল্ডস। এই কারণে পাজেরো গাড়িটির কমফোর্ট প্রাডোর চেয়ে বেশি। আরও যেই জিনিসটা ভালো লাগে, এই জেনারেশনটি বাজারে আসে সেই ২০০৬ সালে, এই ১৫ বছরে শুধুমাত্র ফগলাইটের কাছে একটা ডে-টাইম রানিং লাইট যোগ হয়েছে, এছাড়া আর কোনো চেঞ্জ আসেনি, তাই এই গাড়িটি এখনো ২০২১ মডেলের প্রাডোর পাশে রেখে ফ্লেক্স করা যাবে, এতোটাই টাইম-লেস ডিজাইন।
কিন্তু ইন্টেরিওর হচ্ছে এই গাড়িটির সবচেয়ে বড় দুর্বল দিক বা উইক-পয়েন্ট। সেই ২০০৬ সালে এই গাড়ির ইন্টেরিওর ছিলো সময়র চেয়ে এগিয়ে, কিন্তু ১৫ বছর পরে এখন অনেক ব্যাকডেটেড। বেইজ ইন্টেরিওর অ্যাভাইলেবল এটা একটা ভালো দিক, গাড়িতে ব্যাসিক কাজগুলো করা যায় এমন একটা ছোট ইনফোটেইনমেন্ট সিস্টেম আছে, যেটির উপরে আছে একটি অন-বোর্ড কম্পিউটারের ডিসপ্লে। পুরো ড্যাশ প্যানেলটিতে কাঠ দিয়ে কাজ করা, কিন্তু ড্যাশবোর্ডটাও আবার ওদিকে কালো কালার। নিকেল গার্নিশ করা ২টি ডায়াল আছে এসির সবকিছু কন্ট্রোল করার জন্য। এখন, ওয়াও-ফ্যাক্টর হচ্ছে মিতসুবিশি বাংলাদেশের ডিলার থেকে সেট করা একটি অপশন। সেটা হচ্ছে, ইনফোটেইনমেন্ট সিস্টেমটি এখন যথেষ্ট বুড়ো হয়ে যাওয়ার কারণে র্যাংস থেকেই এখন টেসলার মতো ইয়া বিশাল লম্বা একটা ডিসপ্লে লাগিয়ে দেয়, যার মধ্যে টেসলার মতো এসি কন্ট্রোলসও সব ডিসপ্লেতেই দেওয়া। আপনি চাইলেই এক্সট্রা খরচে তারা এটি লাগিয়ে দিবে ও গাড়ির দাম একবারে নিবে এবং ওয়ারেন্টিও দিবে এটার জন্য! সেন্টার কনসোলে স্যাটিন সিলভার ফিনিশিং দেওয়া, এবং ২টা লেভার দেওয়া। এখন, জিনিসটি দেখতে বেশ দারুণ লাগে যে এভাবে আগেকার ম্যানুয়াল গিয়ারের পাজেরোর মতো ২টা লেভার, কিন্তু এখানে ২টিই গিয়ার লেভার না কারণ গাড়িটি অটো গিয়ারের। বড় যেটি, সেটি হচ্ছে গিয়ার লেভার, ছোটটি গিয়ার রেঞ্জের লেভার। অর্থাৎ, ছোট গিয়ারটি দিয়ে আপনি সিলেক্ট করতে পারবেন টু-হুইল-ড্রাইভ নাকি ফোর-হুইল-ড্রাইভে গাড়ি চালাবেন, এবং ফোর-হুইল-ড্রাইভে হলে অটো গিয়ারটি কি হাই নাকি লো গিয়ারের দিকে থাকবে। আবার এই লেভারের মাধ্যমে সেন্টার ডিফারেনশিয়াল লকও করা যাবে। এই গাড়িটিতে ম্যানুয়াল মোড থাকলেও প্যাডেল শিফটার নাই। মাঝের সারিতে অনেক অনেক জায়গা, কেউই সেখানে জায়গার অভাববোধ করবে না। একটা আলাদা এসি কন্ট্রোল প্যানেলও আছে এখানে। কিন্তু পিছনের সারি অর্থাৎ ৩য় সারিতে শুধু বাচ্চারা বসতে পারবে, এতো কম লেগরুম। যেই জিনিসটি প্রাডোর থেকে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে রাখে পাজেরোকে, সেটা হচ্ছে সানরুফ। প্রাডোর সানরুফ উপভোগ করতে পারে শুধু ড্রাইভার আর তার পাশের যাত্রী, কিন্তু পাজেরোর সানরুফটা মাঝের সারি পর্যন্ত চলে এসেছে। আর স্পিকার কোয়ালিটি তো সবকিছুর উর্ধ্বে, এই গাড়িতে আছে রকফোর্ড ফোসগেট অ্যাকুইস্টিক সাউন্ড সিস্টেম যার মিউজিক কোয়ালিটি আপনার লোম দাঁড় করিয়ে দিবে।
পাজেরোতে আছে অকটেন-চালিত ৩ হাজার সিসির ভি-৬ ইঞ্জিন, যার শক্তি ১৮৫ হর্সপাওয়ার এবং ২৭০ নিউটন-মিটার টর্ক। প্রাডোর অকটেন-ভ্যারিয়েন্টের চেয়ে নিঃসন্দেহে বেশি পাওয়ারফুল, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু এই ইঞ্জিনটি ভি-৬ হওয়ার কারণে বেশি স্মুথ, ভাইব্রেশন অনেক কম এই ইঞ্জিনটিতে। কারণ, একায় তো ৬টি সিলিন্ডার তার উপর আবার ভি-শেপে সিলিন্ডারগুলো সাজানো বলে একসাইডের ভাইব্রেশন আরেকসাইড দিয়ে কমে যায়। পার্ফরম্যান্সের দিক থেকে অকটেন-চালিত প্রাডোকে অনায়াসে হারিয়ে দিবে এই পাজেরো। সাথে বেশি টর্কের জন্য অফ-রোডেও বেশি ক্যাপেবল পাজেরো। কিন্তু হ্যাঁ, প্রাডোর চেয়ে আবার পাজেরো বেশি তেল খায়। কিন্তু খুব যে বেশি তাও না, ১৯/২০ পার্থক্য।
সবশেষে প্রাইস! পাজেরো গাড়িটি Mitsubishi Motors Bangladesh Rangs Limited-এ অ্যাভাইলেবল, দাম ১ কোটি ১০ লাখ টাকা ব্র্যান্ড নিউ। সম্ভবত এই বছরেই পাজেরো শেষ পাওয়া যাবে বাংলাদেশে। জাপানে তো অলরেডি ২০১৯ সালেই বিক্রি বন্ধ হয়ে গেছে, এখন আস্তে আস্তে সব মার্কেট থেকেই গুটিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
©DriVinci Bangladesh